AsiaNews24 | News Details

‘সাহিত্যের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক মধুর হয় না’

Category : Art-Literature | Sub Category : News Posted on 2020-11-01 01:35:48


‘সাহিত্যের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক মধুর হয় না’

১৯৫১ সালের ১৮ জানুয়ারি জন্ম নেয়া সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বাংলাদেশের খ্যাতনামা কথাসাহিত্যিক ও সাহিত্যসমালোচক।


মাইকেল মধুসূদন দত্ত, কাজী নজরুল ইসলাম ও শামসুর রাহমানের ওপর তার গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা রয়েছে।


উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ: ‘থাকা না থাকার গল্প’, ‘কাচ-ভাঙ্গা রাতের গল্প’, ‘অন্ধকার ও আলো দেখার গল্প’ এবং ‘প্রেম ও প্রার্থনার গল্প’।


উল্লেখযোগ্য উপন্যাস: ‘আধখানা মানুষ্য’, ‘দিনরাত্রিগুলি’, ‘আজগুবি রাত’ এবং ‘তিন পর্বের জীবন’। প্রবন্ধ ও গবেষণাগ্রন্থের মধ্যে ‘নন্দনতত্ত্ব’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।


পেশাগত জীবনে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম দীর্ঘদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসরের পর ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশে যোগ দিয়েছেন।


সাহিত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার এবং সম্মাননা পেয়েছেন।


সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: জুননু রাইন


যুগান্তর: করোনায় প্রায় ঘরবন্দি সময়ে কী লিখছেন, কী পড়ছেন?


সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও একটি কোর্স পড়াই। মহামারীকালে পড়ানোটি চলছে অনলাইনে। ফলে পড়ালেখা সবই প্রায় একাডেমিক। ফাঁকে ফাঁকে অন্য পড়াও হচ্ছে। তরুণ কথাসাহিত্যিকদের ক’টি বই পড়লাম। একটি গল্প লিখলাম। ইংরেজি-বাংলায় প্রবন্ধ লিখলাম গোটা তিনেক।

যুগান্তর : করোনা-পরবর্তী আর্থসামাজিক পরিস্থিতি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে?


সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : ব্যাপক। অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়তে পারে। ক্লাসে বসে পড়াশোনার দিন কবে ফিরবে, কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। ততদিন যদি অনলাইন শিক্ষা চলে, ডিজিটাল বৈষম্যের কারণে শিক্ষায় একটি বড় অসমতা দেখা দেবে। অনলাইন পড়াশোনা বেশ খরুচে ব্যাপার। সেই খরচ মেটানোর সাধ্য অসচ্ছল পরিবারগুলোর নেই। মহামারী অসংখ্য পরিবারকে পথে বসিয়েছে। তাছাড়া পরীক্ষা দেয়া-নেয়ার বিষয়টি অনেক বদলে যাবে। শিক্ষায় সবার অন্তর্ভুক্তির আয়োজন জোর হারাবে।


যুগান্তর: আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ থেকে ছাত্রছাত্রীদের নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জনের সুযোগ আগের চেয়ে কমেছে না বেড়েছে? যদি কমে থাকে, কী কী সূচকে এবং কেন কমেছে? এর থেকে উত্তরণের উপায় কী?


সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : সব সূচকেই কমেছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ব্যস্ত পরীক্ষার্থী তৈরিতে। মুখস্থ করা আর পরীক্ষা দেয়ার বৃত্তে বন্দি এ ব্যবস্থা নৈতিকতা আর মানবিকতা বলি- কিছু-ই শেখাতে পারবে না। টিউশন-নোট বই কি নেতৃত্ব শেখায়?


শিক্ষকরা হয়তো চেষ্টা করেন; কিন্তু পরিবেশ প্রতিকূল হলে তারা কী করবেন। তবে নেতৃত্ব শেখানোর বিষয়ে আমার অভিমত- এদেশে কর্মীর চেয়ে নেতা বেশি; কাজেই নেতৃত্বের চেয়ে সবাই মিলে কাজ করা শেখানোটি বেশি জরুরি। নেতৃত্বের শিক্ষাটি সমষ্টি থেকেই পাওয়া যায়। উত্তরণের উপায়- একেবারে প্রাথমিক পর্যায় থেকে আমূল বদলে ফেলা শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা এবং পরীক্ষা কমিয়ে সৃজনশীলতার চর্চা বাড়ানো।


খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, স্বেচ্ছাসেবা, প্রকৃতিপ্রেম, মানবিকতা ও সমাজমনস্কতা- এসবকে শিক্ষার ভিত্তি করা। স্কুলেই সব পড়াশোনা শেষ করা, যাতে টিউশনপ্রথা কূল হারায়। শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে এবং তাদের বেতনভাতা বাড়িয়ে পেশাটিকে আকর্ষণীয় করতে হবে।


যুগান্তর: গণতন্ত্রের সঙ্গে শিল্প-সাহিত্যের সম্পর্কটি কী ধরনের? বাংলাদেশে সে সম্পর্কটি বর্তমানে কেমন আছে বা কেমন থাকা দরকার?


সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : সুহৃদের মতো। তবে গণতন্ত্র আর সরকার বা রাষ্ট্র এক নয়। বাংলাদেশে গণতন্ত্রও আদর্শ জায়গায় নেই। ফলে এ সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কটি অবশ্য কোথাও মধুর হয় না; যেহেতু কবি-সাহিত্যিকরা বরাবরই প্রতিবাদী, ন্যায় ও সুনীতির পক্ষপাতী। বাংলাদেশেও তাই। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, রাষ্ট্রের সঙ্গে শিল্প-সাহিত্যের দূরত্ব মেপেই চলা উচিত। তাতে স্বাধীনতাটি থাকে।


যুগান্তর: সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রুখতে নিজেদের সংস্কৃতিচর্চা জরুরি, না বিদেশি সংস্কৃতি ঠেকানো জরুরি? বর্তমানে বাংলাদেশে এ বিষয়টি কীভাবে মোকাবেলা হচ্ছে বা কীভাবে মোকাবেলা করা উচিত?


সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : অবশ্যই নিজেদের সংস্কৃতিচর্চা। বিদেশি সংস্কৃতির ভালো দিকগুলো গ্রহণ করলে ক্ষতি নেই, তবে গ্রহণ-বর্জনের ক্ষমতাটি তৈরি করে দেয় নিজের সংস্কৃতির শক্তি। বাংলাদেশে সংস্কৃতিচর্চা হচ্ছে খণ্ডিতভাবে। দৃশ্যমাধ্যমবাহিত হয়ে বিদেশি যেসব আবর্জনা আসছে, সেগুলোকে আমরা মহা-আনন্দে গ্রহণ করছি। ফলে সুন্দর-অসুন্দরের পার্থক্য হারিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি পরিবার সন্তানদের যদি জীবনের শুরু থেকে কিছু নৈতিকতা শেখায়, বই পড়া, প্রকৃতি পাঠ শেখায়; যদি স্কুলের কার্যক্রমে এবং পাঠ্যক্রমে সংস্কৃতিচর্চা ও পাঠ থাকে; যদি সমাজে সংস্কৃতিচর্চার প্রতি সমর্থন বাড়ে, তাহলে মোকাবেলাটি কার্যকর হবে।


যুগান্তর: শিক্ষিতরা (নৈতিক গুণাবলিসংবলিত শিক্ষা) সাহিত্য বাঁচিয়ে রাখে, না সাহিত্য মননশীল নাগরিক তৈরি করে?


সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : শিক্ষিতরা যেহেতু পড়েন, শিক্ষাবঞ্চিতরা পড়তে পারেন না- প্রথম কথাটিই তো ঠিক। সাহিত্য মনের ওপর প্রভাব ফেলে; কিন্তু খুব কম মানুষই সেজন্য প্রস্তুত থাকেন; কম লেখক-ই পাঠকের মননশীলতায় বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেন।


যুগান্তর: বর্তমানে বাংলাদেশের সাহিত্যে ভালো লেখকের অভাব নাকি ভালো মানের পাঠকের অভাব?

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : ভালো পাঠকের সংখ্যা কম।


যুগান্তর: উন্নত দেশের সমৃদ্ধ সাহিত্য; বিশেষ করে ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ ও ইংরেজি সাহিত্যের তুলনায় গুণগত মান বা দার্শনিক দিক থেকে আমাদের সাহিত্য পিছিয়ে? যদি তা-ই হয়, এ প্রযুক্তির যুগেও আমরা এগিয়ে যেতে না পারার বিশেষ কারণগুলো কী কী?


সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : ফরাসি সাহিত্য যেটুকু পড়েছি, তা অনুবাদে পড়েছি। তাই গুণগত মান নিয়ে মন্তব্য করতে পারব না। আমার মনে হয়েছে, আমাদের সাহিত্য দর্শনের গভীরতা খুঁজতে এখন আর উৎসাহী না। গুণের দিক থেকে উতরে গেলেও দর্শনচিন্তার ক্ষেত্রে একটি অভাব আমাদের অনেক গল্প-উপন্যাস-কবিতায় দেখতে পাই। সংস্কৃতির গভীর থেকে শক্তি গ্রহণ না করতে পারলে অতি-উন্নত প্রযুক্তি দিয়েও আমাদের কোনো অভাব পূরণ হবে না।


যুগান্তর: লেখক হিসেবে বহুল আলোচিত; কিন্তু আপনার বিবেচনায় এদের নিয়ে এতটা আলোচনা হওয়ার কিছু নেই- এমন তিনজন লেখকের নাম-


সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : লেখালেখি নিয়ে যত আলোচনা হবে, ততই ভালো; তাতে লেখার (ও লেখকের) ভালো-মন্দ প্রকাশ্য হবে। যদি কেউ বহুল আলোচিত হোন, নিশ্চয় তার কারণ আছে। আমি কেন সেই লেখালেখির ওপর একটি মূল্যবিচার আরোপ করব? আমার পড়াশোনাও তেমন নয় যে, সেই মূল্যবিচারে যাব।


যুগান্তর: লেখকদের প্রায়ই বলতে শোনা যায়, ‘এখনকার পাঠকরা বড় লেখা পড়েন না’। লেখক যদি এভাবে চিন্তা করেন, তাহলে ধরে নেয়া যায়- পাঠককে অনুসরণ করেই লেখক লিখছেন। এক অর্থে পাঠকের রুচির পেছনে পেছনেই লেখক এগিয়ে চলেছেন। হওয়ার কথা, সাধারণ মানুষ বা পাঠকরাই লেখককে অনুসরণ করবে।


সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : লেখকরা লিখবেন তাদের চিন্তাভাবনা, সমাজনিরীক্ষণ, ইতিহাসজ্ঞান, কালচেতনা ও শৈলীবৈশিষ্ট্য- এ রকম অনেক কিছুর প্রতিফলন ঘটিয়ে। তারা কেন পাঠকের পেছনে ছুটবেন? এ কাজটি ‘পপুলার’ লেখকরা করেন; কিন্তু সাহিত্যসভায় তারা থাকেন- যদি থাকেন- পেছনের সারিতে।


যুগান্তর: যাদের লেখা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, জীবিত এমন তিনজন লেখকের নাম-


সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : এই এক-দুই-তিনের হিসাবটি আমি পছন্দ করি না। আমি যত পড়ি, দেখি- অনেকেই অনেকভাবে আমাকে ভাবান। সমাজ তৈরি থাকলে তাদের খোঁজ পড়ত। সমাজ কি তৈরি?


যুগান্তর: এখানে গুরুত্বপূর্ণ লেখকরা কি কম আলোচিত? যদি সেটি হয়, তাহলে কী কী কারণে হচ্ছে? এমন তিনটি সমস্যার কথা উল্লেখ করুন-


সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : সাহিত্যের আলোচনা খুব কমই হয়; ভালো লেখকদের নিয়ে আলোচনাও। কারণগুলোর মধ্যে আছে- সমালোচনা-সাহিত্যের ভিত্তিটি দুর্বল হয়ে যাওয়া, ভালোমানের সাহিত্য জার্নাল ও সাহিত্য সম্পাদকের অভাব এবং সমালোচনা-সাহিত্যের প্রতি পাঠকের উৎসাহ কমে যাওয়া। ছোট কাগজগুলোয় একসময় চমৎকার সাহিত্য আলোচনা হতো, এখন তাদের দুর্দিন চলছে।


যুগান্তর: সাহিত্য থেকে হওয়া আপনার দেখা সেরা সিনেমা-


সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : সেরা না; পছন্দের। ডেভিড লিনের ডক্টর জিভাগো।

যুগান্তর: জীবিত একজন আদর্শ রাজনীতিবিদের নাম বলুন-


সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : রাজনীতি আমার চায়ের পেয়ালা নয়।


যুগান্তর: একজন অগ্রজ ও একজন অনুজ লেখকের নাম বলুন, যারা বাংলা সাহিত্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ-


সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : অগ্রজ অনেক; অনুজও অনেক। একজন করে বেছে নিতে হবে কেন? কেউ তো একা সব গল্প-কবিতা-নাটক লিখে অন্যদের অগুরুত্বপূর্ণ করে দেন না।

যুগান্তর: এমন দুটি বই, যা অবশ্যই পড়া উচিত বলে পাঠককে পরামর্শ দেবেন।


সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : অবশ্যপাঠ্য বলে কিছু নেই। প্রিয় বইয়ের তালিকাও আমার সময়ে সময়ে বদলায়। এ মুহূর্তে সেই তালিকায় আছে রশীদ করিমের বড়ই নিঃসঙ্গ এবং শেমাস হিনির বেউলফ। যুগান্তরের পাঠকরা পড়ে দেখতে পারেন।


যুগান্তর: লেখক না হলে কী হতে চাইতেন?


সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : লেখক না হলে তো এ প্রশ্ন আমাকে করা হতো না। তখন শিক্ষকই থাকতাম; এখন যেমন আছি।


যুগান্তর: আপনার সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় ও সবচেয়ে খারাপ লাগার বিষয়-


সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : আলস্য। ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো কাজ করা।

Leave a Comment: